সরকারের ১৮০ দিন: টেকসই উন্নয়নের নতুন দিগন্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

জাতীয়

টানা দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী ও একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রথম ১৮০ দিনে ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি’ ও ‘দলীয়করণকৃত প্রশাসন’ পুনর্গঠন করে আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ নির্মাণের কৌশলগত ভিত্তি স্থাপন করেছে জনগণের এই সরকার।

‘প্রতিহিংসার রাজনীতি’ থেকে বেরিয়ে এসে ‘সহনশীলতা ও জবাবদিহিতার রাজনীতি’ এবং নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফার আলোকে গত ছয় মাসে ব্যাপক সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস (১৮০ দিন) পূর্তি উপলক্ষে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং।

সভায় ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক একটি ই-বুকের মাধ্যমে সরকারের বিগত ছয় মাসের গণমুখী ও বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়।

ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান ও প্রশাসনে স্বচ্ছতা

নতুন সরকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে।

ব্যক্তিপূজা বন্ধে সরকারি-বেসরকারি ব্যানারে প্রধানমন্ত্রীর ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরে অপ্রয়োজনীয় নেতার ছবি টানানোর সংস্কৃতিও বন্ধ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী নিজেই প্রটোকল সংস্কৃতি ভেঙে সাধারণ নাগরিকের মতো ট্রাফিক আইন মেনে চলছেন। মাত্র ছয়জন ছাড়া বাকি সব মন্ত্রী-উপদেষ্টার পুলিশি প্রটোকল বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তার মাসিক মূল বেতনের (১ লাখ ১৫ হাজার টাকা) ১০ শতাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দিচ্ছেন। সরকারি গাড়ি কেনা, অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর এবং আপ্যায়ন ব্যয়ও ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে।

অর্থনীতিতে ‘৩-আর’ কৌশল ও ‘জীবনবাস্তব’ বাজেট

অর্থনৈতিক পঙ্গুত্ব কাটিয়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ‘জীবনবাস্তব’ বাজেট পেশ করেছে সরকার। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে ‘৩-আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন, রিকনস্ট্রাকশন) কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।

গত ১২ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া পাচারকৃত অর্থ ফেরাতে ১৩টি দেশে ২৩টি মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) পাঠানো হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ তহবিল’ এবং ‘ব্লু ইকোনমি’ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার মৎস্য রপ্তানির লক্ষ্যে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ২৪ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত করে রেকর্ড গড়েছে সরকার।

‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়ন

সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, ‘কৃষক কার্ড’ এবং ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হয়েছে। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ মাধ্যমে যোগ্য পরিবারের নারী প্রধানের ব্যাংক হিসাবে মাসিক আড়াই হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে। প্রথম ১৮০ দিনে ৭০ হাজার ৮৬১টি কার্ড বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সার ও বীজ সহায়তা হিসেবে ২০ হাজার ৪৮৩ জন কৃষককে ৫ কোটি ১২ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে যুগান্তকারী রূপান্তর

মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে জিডিপির ২ শতাংশ (১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা) করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি সংসদীয় আসনে ছেলে ও মেয়েদের জন্য পৃথক দুটি করে মোট ৬০০টি সরকারি আবাসিক মডেল স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে।

অন্যদিকে, ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’ দর্শনে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যার ৮০ শতাংশই নারী। এছাড়া ৫ হাজার নতুন এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ এবং প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘ইলেকট্রনিক হেলথ কার্ড’ চালুর প্রক্রিয়া চলছে। বিদেশে চিকিৎসার পেছনে বছরে ব্যয় হওয়া ৫ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করাই এর লক্ষ্য।

পরিবেশ ও অবকাঠামো

পরিবেশ সংরক্ষণে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রথম ১৮০ দিনেই ২ কোটি ২২ লাখ চারা রোপণ করা হয়েছে। কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় মাত্র ১৫ দিনে দেশজুড়ে ২ হাজার ১৬৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া দেশের সব সড়ক ও সেতুতে সমন্বিত ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) চালু এবং প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য রেলে ২৫ শতাংশ ছাড় কার্যকর করা হয়েছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে সরকার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। দীর্ঘ চার দশক পর বাংলাদেশ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের দায়িত্ব পেয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রথম নারী মহাসচিব আইরিন খানকে জাতিসংঘে স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার উন্মুক্ত এবং চীন সফরে ২১টির বেশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ ও বিচারিক সংস্কার

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষায় গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এ রূপান্তর করা হয়েছে। ‘জুলাই শহীদ ইনডেমনিটি অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে শহীদদের আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি শহীদ পরিবারকে ৩০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র এবং মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া ৪৬ লাখ মামলার জট কমাতে ‘ই-জুডিশিয়ারি’ ব্যবস্থা চালু এবং উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। 


  • Tags

সর্বশেষ সংবাদ

এই বিভাগের আরও খবর