রাজধানীর যানজট কমানো এবং উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে নির্মাণাধীন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের প্রতি কিলোমিটারের নির্মাণ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শুরুতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭০৪ কোটি টাকা। তবে কাজ শুরুর ৩ বছর ৮ মাসের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় বেড়েছে ৪২৩ কোটি টাকা। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণকাজ শেষ হতে ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
তবে ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দৃশ্যমান অগ্রগতিও হয়েছে প্রকল্পটিতে। গত জুন পর্যন্ত সার্বিক অগ্রগতি পৌঁছেছে ৭১ দশমিক ৫০ শতাংশে এবং ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ৬৫ শতাংশ। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে আগামী ১০ আগস্টের মধ্যে এক্সপ্রেসওয়ের কিছু অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। এতে প্রকল্পের প্রথম ধাপের সুফল পেতে শুরু করবেন আশপাশের এলাকার মানুষ ও ওই পথের যাত্রীরা।
রাজধানীর দ্বিতীয় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালের ১২ নভেম্বর। রাজধানীর যানজট কমানোর পাশাপাশি উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুতগতির যোগাযোগ নিশ্চিত করাই প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য। দেশের প্রথম ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে নির্মিত হলেও দ্বিতীয় এই এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে বিদেশি ঋণের অর্থায়নে। প্রকল্পটির ঠিকাদার চায়না ন্যাশনাল মেশিনারি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট কর্পোরেশন (সিএমসি) এবং অর্থায়ন করছে এক্সিম ব্যাংক অব চায়না।
এদিকে যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বলছেন, টার্নকি পদ্ধতিতে একই ঠিকাদার নকশা ও নির্মাণকাজ করায় এটি ইতিবাচক দিক। কিন্তু শুরুতেই অতিরিক্ত জমি, ড্রেনেজসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো পরিকল্পনায় রাখা উচিত ছিল। প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হওয়ায় এর আর্থিক ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা আগের মতো রয়েছে কিনা, তা পুনর্মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আগস্টেই খুলছে ধউর-আশুলিয়া সার্ভিস লেনের দুই সেতু
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ধউর মোড় থেকে আশুলিয়া বাজার পর্যন্ত অংশ এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে তুরাগ নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয়। এ কারণে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের পাশাপাশি স্থানীয় যানবাহন চলাচলের জন্য উড়ালপথে দুই লেনের পৃথক দুটি সার্ভিস লেন সেতুর নকশা করা হয়েছে।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ এ অংশের সার্ভিস লেনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ইতোমধ্যে কালো পিচ ঢালাই সম্পন্ন হয়েছে। এখন চলছে সড়কে রোড মার্কিংয়ের কাজ। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সেতু দুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।
সার্ভিস লেন চালু হওয়ার পর নিচের বিদ্যমান সড়ক বন্ধ করে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ভায়াডাক্ট নির্মাণকাজ শুরু হবে। এজন্য পুরোনো সেতুগুলোও অপসারণ করা হবে। এ অংশে তুরাগ নদীর প্রবাহ উন্মুক্ত রাখতে নিচে কোনো বাঁধ বা স্থায়ী সড়ক রাখা হবে না। একই সঙ্গে এখানে নির্মাণ করা হচ্ছে প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ টোল প্লাজা। ভারী যানবাহনের চাপ সহনীয় করতে সেখানে প্রশস্ত ভায়াডাক্ট ও উচ্চ ধারণক্ষমতার বড় পাইল ক্যাপ নির্মাণ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ধউর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ৩ দশমিক ৭১ কিলোমিটার অংশের দুটি সার্ভিস লেন সেতু আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এরপর নিচের বিদ্যমান সড়ক বন্ধ করে সেখানে মূল এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এজন্য পুরোনো সেতুগুলোও অপসারণ করা হবে।
প্রকল্পের কাজে যা দেখা গেল
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের এক্সটেনশনের সঙ্গে আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সংযোগের কাজ দৃশ্যমান অগ্রগতি পেয়েছে। সম্প্রতি প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সংযোগস্থলে স্প্যান বসানো হয়েছে। কাওলা রেলগেট পর্যন্ত আরও কয়েকটি স্প্যান স্থাপন করা হলেও ওয়ার্কিং ইয়ার্ড থাকায় কাওলা থেকে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত অংশে কোনো কাজ হয়নি।
বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের পূর্ব পাশ থেকে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের বটতলা মোড় পর্যন্ত সব পিলার ও পিলার ক্যাপ নির্মাণ শেষ হয়েছে। স্টেশনের সামনে চারটি স্প্যানও বসানো হয়েছে। বটতলা মোড় থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত স্প্যান স্থাপন ও ডেক ঢালাই শেষ হয়েছে। বর্তমানে সেখানে সাইড ব্যারিয়ার নির্মাণ চলছে। তবে আব্দুল্লাহপুর মোড়ে বিআরটি ফ্লাইওভারের উপরের তিনটি স্প্যান এখনও বসানো হয়নি, যদিও উঁচু পিলারগুলোতে পিলার ক্যাপ প্রস্তুত রয়েছে।
আব্দুল্লাহপুর থেকে উত্তরা সুইচগেট, কামারপাড়া হয়ে ধউর মোড় পর্যন্ত এক্সপ্রেসওয়ের মূল কাঠামো প্রায় সম্পূর্ণ। ডেক স্ল্যাবের ফিনিশিং, ওয়াটারপ্রুফিং, পেভমেন্ট, কংক্রিট ডিভাইডার ও সাইড ব্যারিয়ারের কাজ শেষ পর্যায়ে। নিচের একপাশের সড়ক দিয়ে কয়েক মাস ধরে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।