ইতিহাস সাক্ষী, বার্সেলোনা জেতালেই বিশ্বজয় করে স্পেন
ইতিহাস সাক্ষী, বার্সেলোনা জেতালেই বিশ্বজয় করে স্পেন
খেলাধুলা
২৫ মে, ২০২৬। লুইস দে লা ফুয়েন্তে মাত্রই বিশ্বকাপের দলটা ঘোষণা করেছেন। সে স্কোয়াডটা দেখে চক্ষু চড়কগাছ হওয়ার যোগাড়। আরে এ কী! রিয়াল মাদ্রিদের একজনও এই স্কোয়াডে নেই!
ব্যস সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। হওয়ারই কথা, কারণ স্পেনের ইতিহাসে যে এমন দিন আর কখনো আসেনি যে বিশ্বকাপে দল খেলতে যাবে দেশটির সবচেয়ে বড় ক্লাবের খেলোয়াড় ছাড়াই! থমাস রনকেরো, ইয়োসেপ পেদরেরলসহ একাধিক গণ্যমান্য সাংবাদিক তো রীতিমতো একগাদা ষড়যন্ত্র তত্ব নিয়েও হাজির হলেন; বললেন, ‘সে স্পেন নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়, সে মাদ্রিদকে হেয় করতেই বেশি মনোযোগী।’
সেসব শুনে কি স্পেন কোচ একটু হলেও মুচকি হেসেছিলেন? কেন হাসবেন না? যে দল নিয়ে দুই বছর আগে ইউরো জিতেছিলেন, সেই দলের মূল খেলোয়াড়রাই যে আছেন এই বিশ্বকাপ স্কোয়াডে, যাদের নিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখা যায়, তিনি যে ডেকেছেন তাদেরই!
সেসব মনে থাকলেও কোচ দে লা ফুয়েন্তের মনে হয়তো একটা কথা খেলে যায়নি। ইতিহাস যে বলে, স্পেন বিশ্বকাপ জিতলে তাতে রিয়াল মাদ্রিদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বার্সেলোনারই অবদান থাকে বড়!
১৬ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যে প্যাটার্নটা প্রথমবার দেখেছিল বিশ্ব, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সেটা আরও একবার পুনর্মঞ্চায়িত হলো। একেবারে হুবহু নয় অবশ্যই।
২০১০ সালে জোহানেসবার্গের ওই ফাইনালে তখন অতিরিক্ত সময় চলছে, তখনই সামনে চলে এলেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। গোল করাটা ঠিক তার কাজ নয়, করানোতেই বেশি মনোযোগ থাকে সবসময়। সেই তিনি ১১৬ মিনিটে ফাঁকায় পড়ে গেলেন নেদারল্যান্ডসের গোলমুখে, পাসটা পেয়েছিলেন সেস্ক ফ্যাব্রেগাসের কাছ থেকে, তিনিও একটা সময় বেড়ে উঠেছেন বার্সার অ্যাকাডেমি লা মাসিয়া থেকেই। ইনিয়েস্তা সেবার ভুল করেননি, গোলটা করে স্পেনের জার্সিতে প্রথম তারকাটা এঁকে দিয়েছিলেন তখুনি।
তার আগেও কি দলটায় বার্সার দাপট কম ছিল? সেমিফাইনালের গোলটা এসেছিল কার্লোস পুয়োলের মাথা থেকে। তারও আগে ডেভিড ভিয়া করেছিলেন ৫ গোল, সে বিশ্বকাপের আগেই তিনি নাম লিখিয়েছিলেন বার্সায়। প্রথম বিশ্বজয়ের মিশনে তাই বার্সার অবদানটা বড় ছিল, তা বলাই চলে।
এবারও কি কিছু কম ছিল? সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে যখন হারাল স্পেন, তখন বার্সেলোনার কেউ কার্লোস পুয়োল হয়ে ওঠেননি বটে; কিন্তু ইয়ামাল ঠিকই ছাপ রেখেছিলেন। প্রথম গোলটায় পেনাল্টি আদায় করে দিলেন; দ্বিতীয় গোলে বার্সার দানি অলমো গোলটা বানিয়ে দিলেন পেদ্রো পোরোকে, সে গোলেও পরোক্ষ ছাপ ছিল ইয়ামালের, আন্ডারল্যাপ নিয়ে পোরো উঠলেন, এক ডিফেন্ডারকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে সেটার জন্য জায়গা বানিয়ে দিয়েছিলেন এই ইয়ামালই তো!
পুরো টুর্নামেন্টেই স্পেন গোল হজম করেছে মোটে ১ গোল। ক্লিনশিট রেখেছে ৭ ম্যাচে। তাতে বড় অবদান ছিল বার্সেলোনারই পাউ কুবারসির। এতটাই যে, বিশ্বকাপের সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কারটা উঠে গেছে তার হাতে।
তবে এত কিছুর পরও স্পেন ফিরতে পারত খালি হাতে, যদি না একজন ফেররান তরেস দাঁড়িয়ে যেতেন। ফাইনালে ১০ জনের আর্জেন্টিনার জালও যখন ভেদ করা যাচ্ছে না, তখনই সামনে চলে এলেন ফেররান। বার্সেলোনাতেই তো তাকে কত সমর্থক শাপশাপান্ত করেন, সেই তিনিই কি না গোটা দেশের মধ্যমণি বনে গেলেন। নিকো উইলিয়ামসের নামিয়ে দেওয়া বলটা আগুনে এক শটে পাঠালেন আর্জেন্টিনার জালে। স্পেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বনে গেল, সেটা তার কল্যাণেই তো!
১৬ বছর আগের আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পদাঙ্কটা অনুসরণ করলেন ফেররান তরেস। সঙ্গে সঙ্গে অনুচ্চারে ২৫ মে’র ওসব সমালোচনার জবাবটাও দেওয়া হয়ে গেল। তবে তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়াল আরেকটা কথা। ‘ইতিহাস সাক্ষী, বার্সেলোনা জেতালেই বিশ্বজয় করে স্পেন’ — সেটা বোধহয় স্পেনের অভিধানে একটা প্রবাদ হয়েই ঢুকে গেল এখন।